অর্থনীতি

দেশের অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটাতে পারে তাঁত শিল্প

দেশের তাঁতশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরসহ দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প শত বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। বিপুল সম্ভাবনাময় এ খাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ, প্রান্তিক তাঁতিদের মধ্যে সহজ শর্তে ঋণদান কর্মসূচি গ্রহণ, নিয়মিত তদারকি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হলে এ খাতে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। সেইসঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে চাহিদা মাফিক দেশীয় তাঁতবস্ত্রের বাজার সৃষ্টি করা হলে এ খাতে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। ইতোমধ্যেই শাহজাদপুরসহ বৃহত্তর পাবনায় উৎপাদিত দেশীয় তাঁতবস্ত্র ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাপক ভিত্তিতে দেশীয় তাঁতবস্ত্রের উৎপাদন আরো বৃদ্ধি করতে পারলে দেশের অর্থনীতি আরো সুসংহত ও মজবুত হওয়ার পাশাপাশি ঘটতে পারে বিপ্লব।
জানা গেছে, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের অনেক দেশে বাংলাদেশের তাঁতবস্ত্রের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ব্যক্তি উদ্যোগে জার্মানি, ইতালি, ইংল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশে পাঠানো হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী তাঁতবস্ত্র। কিন্তু রপ্তানির পরিমাণ খুবই নগণ্য। বিশেষত পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বাংলাদেশের তাঁতবস্ত্রের ব্যাপক চাহিদার পাশাপাশি বাজার রয়েছে। কেবলমাত্র শুল্ক বৈষম্যের কারণে ভারতে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আশানুরূপ তাঁতবস্ত্র রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড, আমদানি উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারের ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেও বাংলাদেশের ২ লাখ ১২ হাজার ৪১২টি তাঁতি পরিবারের প্রায় ১৫ লক্ষাধিক শ্রমিক এই শিল্পে নিয়োজিত আছেন। দেশে মোট তাঁতের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ১ হাজার ৮৩৪ টি। বাংলাদেশ তাঁত গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালন মি. মোবারক হোসেন সরকার জানান, কাগজে কলমে ওই পরিমাণ তাঁত থাকলেও বাস্তবে তাঁতের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। দেশের প্রায় দুই কোটি জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই শিল্পের ওপর নীর্ভরশীল। সরকারি উদ্যোগে এবং অর্থায়নের অভাবে দেশের সুপ্রাচীন তাঁতশিল্প এখনো সুসংবদ্ধ শিল্পখাতে রূপান্তরিত হতে পারেনি। ফলে এলাকাভিত্তিক এই শিল্পের প্রসার সীমিত পর্যায়েই রয়ে গেছে। অথচ আধুনিক প্রযুক্তি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকাতা দেয়া হলে প্রতি বছর এ খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।
বাংলাদেশ তাঁতবোর্ড কর্তৃক এক জরিপ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের তাঁতবস্ত্রের (শাড়ি) অভ্যন্তরীণ চাহিদা রয়েছে ১৬০ কোটি মিটার। অথচ দেশে তৈরি হচ্ছে মাত্র ১৩৩ কোটি মিটার। তাঁতে তৈরি চেক কাপড়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদা রয়েছে ১২ কোটি মিটার। কিন্তু আমাদের দেশের তাঁতিরা তৈরি করতে পারছে ২ কোটি মিটার। ফলে ১০ কোটি মিটার কাপড়ের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। ফলে সরকারকে বিদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদশিক মুদ্রা বিদেশি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যাচ্ছে। অথচ সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হলে দেশের কাপড়ের চাহিদা মিটিয়ে সহস্রাধিক কোটি টাকার বৈদশিক মুদ্রা অর্জন মোটেও অসম্ভব কিছু নয়।
তাঁতিরা জানান, সুপ্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের কেন্দ্র সিরাজগঞ্জ, পার্শ্ববর্তী পাবনা, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, যশোর, কুষ্টিয়া, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁতশিল্পের বিস্তার ক্রমশ বাড়তে থাকে। তাঁতিদের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়তে থাকে তাঁত ও তাঁতবস্ত্রের উৎপাদন মাত্রা। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আমলে সিরাজগঞ্জসহ দেশের হস্তচালিত তাঁতে উৎপাদিত তাঁতবস্ত্র ব্যাপক সুনাম অর্জনে সক্ষম হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন উদ্যোগে নতুনভাবে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের ক্রমবিকাশ ঘটে। পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বর মাসে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ নং-৬৩ বলে বাংলাদেশ তাঁতবোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৭৮ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে বোর্ডের কার্যক্রম শুরু হয়। তাঁত ব্যবসায় অত্যন্ত লাভজনক ও এর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখে অনেকেই পেশা বদলিয়ে তাঁত ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ব্যাপকভিত্তিতে প্রসারে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক তাঁতিদের মধ্যে অনতিবিলম্বে ব্যাপক ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ ও সহজশর্তে এবং স্বল্পসুদে ঋণদান কর্মসূচি হাতে নেয়া উচিত বলে অভিজ্ঞ মহল মতামত দিয়েছেন। তাঁতিরা জানান, তাঁতবস্ত্র রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের অনেক দেশে বাংলাদেশের তাঁতবস্ত্রের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ব্যক্তি উদ্যোগে কয়েকটি দেশে পাঠানো হলেও রপ্তানির পরিমাণ খুবই নগণ্য। দেশের গার্মেন্টস শিল্পের মতো প্রাচীন এ শিল্পকে সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হলে দেশে উৎপাদিত বস্ত্র দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে প্রতি বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।

এমন আরও সংবাদ

Back to top button
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker